মালয়েশিয়া কলিং ভিসা কবে চালু হবে? জেনে নিন আজকের আপডেট

মালয়েশিয়ায় কাজে যেতে চান, এমন অনেকের মনেই এখন একটাই প্রশ্ন: মালয়েশিয়া কলিং ভিসা কবে চালু হবে? ফেসবুকে একেকজন একেক কথা বলছেন। কেউ বলছেন “সামনের সপ্তাহেই মেডিকেল শুরু”, কেউ বলছেন “সব বন্ধ, কিছুই হচ্ছে না”। এই বিভ্রান্তির মধ্যে সরকারি সূত্রের খবরগুলো এক জায়গায় সাজিয়ে দেওয়াই এই লেখার উদ্দেশ্য।

কলিং ভিসা বলতে কী বোঝায়

সহজ ভাষায়, মালয়েশিয়ার কোনো নিয়োগকর্তা যখন বিদেশ থেকে শ্রমিক আনতে চান, তখন তিনি সরকারের অনুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট কর্মীর জন্য ভিসার আবেদন করেন। একেই সাধারণভাবে কলিং ভিসা বলা হয়। এখানে আপনি নিজে থেকে ভিসার আবেদন করতে পারেন না। আপনার হয়ে আবেদন করে মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তা, আর বাংলাদেশের দিক থেকে কাজটা সামলায় অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি। সেজন্য “কলিং ভিসা কবে খুলবে” প্রশ্নের আসল মানে হলো, মালয়েশিয়া কবে বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মী নেওয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করবে।

মালয়েশিয়া কলিং ভিসা কবে চালু হবে

২০২৪ সালের ৩১ মে মালয়েশিয়া বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ থেকে নতুন বিদেশি কর্মী নেওয়া স্থগিত করে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যাঁরা মালয়েশিয়ায় ঢুকতে পারেননি, তাঁদের নিয়োগের অনুমোদনও বাতিল হয়ে যায়।

এই স্থগিতাদেশের পেছনে ছিল পুরোনো কিছু অভিযোগ। অতিরিক্ত অভিবাসন খরচ, সিন্ডিকেট, অনিয়ম ও শ্রমিক শোষণের অভিযোগে মালয়েশিয়া বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া বন্ধ করেছিল। একই লেখায় বলা হয়েছে, গবেষকদের হিসাবে ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের নিয়োগের সময় অনেক কর্মী মালয়েশিয়ায় চাকরি পেতে চার থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করেছেন। এই খরচ কমানোই এখন দুই দেশের আলোচনার সবচেয়ে বড় বিষয়।

২০২৬ সালে কী কী ঘটল এক নজরে

বিষয়টা বুঝতে সময়ের ক্রম ধরে দেখা ভালো।

এপ্রিল ২০২৬: কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ও মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রীর বৈঠকের পর মালয়েশিয়া শ্রমবাজার খুলে দিতে সম্মত হয়। দুই দেশ “ন্যায্য, নৈতিক ও স্বচ্ছ” নিয়োগের অঙ্গীকার করে। এটাই ছিল দুই বছরের বন্ধ দরজা খোলার প্রথম বড় ইঙ্গিত।

৩০ জুলাই ২০২৬: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমীন কুয়ালালামপুরে সংবাদ সম্মেলনে জানান, আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে সব খাতে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া শুরু করার বাস্তবসম্মত লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। একই সময়ে বলা হয়, প্রথম ধাপে বিএমইটির বদলে সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলকে (BOESL) অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

২২ আগস্ট ২০২৬: মালয়েশিয়ার ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে বাংলাদেশের ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম প্রকাশ করা হয়। এই তালিকা নিয়ে কিছু প্রশ্নও উঠেছিল। কারণ কীভাবে চাকরির অর্ডার ভাগ হবে, সেটা তখনো পরিষ্কার ছিল না।

২৮ আগস্ট ২০২৬: প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানায়, মোট ৩৩৮টি এজেন্সি কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাবে। এর মধ্যে ২৫টি সরাসরি মালয়েশিয়ার বাছাই করা, ৩১২টি সহযোগী এজেন্সি হিসেবে কাজ করবে, আর বোয়েসেলও থাকবে।

১ সেপ্টেম্বর ২০২৬: তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জানান, মালয়েশিয়া আগামী ছয় মাসে প্রায় দুই লাখ কর্মী নিতে আগ্রহী, আর নতুন কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়ার কথা।

১০ হাজার কর্মী যাবেন বিনা খরচে

এই পুরো খবরে সবচেয়ে আলোচিত অংশ এটাই। বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে মালয়েশিয়া ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে বিমান ভাড়াসহ কোনো অভিবাসন খরচ ছাড়াই নিতে রাজি হয়েছে। এই দলের প্রথম ব্যাচ বোয়েসেলের মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে যাবে, আর এর মাধ্যমেই কর্মী পাঠানো আনুষ্ঠানিকভাবে আবার শুরু হবে।

তবে একটা জায়গায় সতর্ক থাকা দরকার। মন্ত্রণালয় তখন প্রথম ব্যাচ কবে যাবে, সেই তারিখ জানায়নি। তাই কেউ যদি আপনাকে “নির্দিষ্ট তারিখে ফ্লাইট” বলে টাকা চায়, সেটা সন্দেহ করার মতো বিষয়।

বাকি ২ লাখ কর্মীর খরচ কত হবে

এ নিয়ে এখনো সরকারি পূর্ণাঙ্গ ঘোষণা আমি পাইনি। দুই দেশের আলোচনার মূল লক্ষ্য খরচ কমানো, আর উপদেষ্টা বলেছেন দালাল ও অসৎ নিয়োগ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু বাকি কর্মীদের কাছ থেকে এজেন্সি আসলে কত টাকা নিতে পারবে, তার সরকারি সীমা জানার আগে কোনো সংখ্যা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। সরকারি বিজ্ঞপ্তি এলে সেটাই চূড়ান্ত ধরবেন।

এখন কী করবেন আর কী করবেন না

এই অংশটা সবচেয়ে জরুরি। কারণ নতুন করে শ্রমবাজার খোলার খবর এলেই দালালদের তৎপরতা বেড়ে যায়।

সরকার স্পষ্ট করে বলেছে, আনুষ্ঠানিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি না আসা পর্যন্ত কাউকে টাকা দেওয়া, মেডিকেল পরীক্ষা করানো বা পাসপোর্ট জমা দেওয়া যাবে না। এই কথাটা মনে রাখুন। ভিসা এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি, এমন অবস্থায় যদি কেউ বলে “টাকা দিলেই সিট নিশ্চিত”, তাহলে ধরে নিন সে আপনাকে ঠকাতে চাইছে।

যা করতে পারেন:

  • পাসপোর্টের মেয়াদ দেখে নিন। অন্তত এক-দেড় বছর মেয়াদ থাকা ভালো।
  • নিজের দক্ষতার সনদ, শিক্ষাগত কাগজ ও জাতীয় পরিচয়পত্র গুছিয়ে রাখুন।
  • বিএমইটির রেজিস্ট্রেশন আছে কি না দেখুন, না থাকলে করে ফেলুন।
  • শুধু সরকারি সূত্রের খবর অনুসরণ করুন: প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বিএমইটি ও বোয়েসেলের নোটিশ।

যা করবেন না:

  • কোনো পরিচিত বা অপরিচিত দালালের হাতে অগ্রিম টাকা দেবেন না।
  • অনলাইনে “ভিসা কনফার্ম” লেখা পোস্ট দেখে বিশ্বাস করবেন না।
  • যাচাই ছাড়া কোনো এজেন্সির কাছে পাসপোর্ট দেবেন না।
  • মেডিকেল পরীক্ষা সরকারি নির্দেশনা আসার আগে করাবেন না।

এজেন্সি যাচাই করবেন কীভাবে

যেহেতু এখন ৩৩৮টি এজেন্সি সুযোগ পাচ্ছে, আপনার এজেন্সি এই তালিকায় আছে কি না, সেটা আগে দেখে নিন। এজেন্সির আরএল (RL) নম্বর আছে কি না, বিএমইটির সাইটে তা মেলে কি না, আর এজেন্সির অফিস সত্যিই আছে কি না, এই তিনটা জিনিস নিজে যাচাই করুন। বোয়েসেলের মাধ্যমে যেতে চাইলে সরাসরি তাদের অফিসিয়াল চ্যানেলে যোগাযোগ করুন, মাঝখানে কোনো মধ্যস্থতাকারীর দরকার নেই।

মালয়েশিয়ায় ইতিমধ্যে থাকা কর্মীদের জন্য কী খবর

এই খবরটা অনেকেই খেয়াল করেন না। মালয়েশিয়ায় এখন প্রায় আট লাখ নিবন্ধিত বাংলাদেশি কর্মী আছেন, আর সরকার সেখানে থাকা অনিবন্ধিত বাংলাদেশিদের বৈধ করার বিষয়েও আলোচনা করছে। অনিবন্ধিত বাংলাদেশি কর্মীদের নিবন্ধনের কাজও চলছে বলে জানানো হয়েছে। আপনার কোনো আত্মীয় সেখানে থাকলে তাঁকে এই বিষয়ে খোঁজ নিতে বলতে পারেন।

গুজব আর সত্যি খবর আলাদা করবেন কীভাবে

ইন্টারনেটে “মালয়েশিয়া কলিং ভিসা আজই চালু” ধরনের অনেক শিরোনাম আছে। কিছু ব্লগ লিখছে ভিসা পুরোপুরি চালু, আবার কিছু লিখছে একেবারে বন্ধ। এই দুই কথার কোনোটাই পুরো সত্য নয়। বাস্তবে সরকারি ঘোষণা এসেছে, এজেন্সির তালিকা ঠিক হয়েছে, কিন্তু কর্মীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আবেদন প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে খুলছে। কোনো খবর বিশ্বাস করার আগে দেখুন সেটা কোনো জাতীয় পত্রিকা বা সরকারি বিজ্ঞপ্তির সূত্রে আছে কি না। যেসব পোস্টে কোনো সূত্র নেই, শুধু “বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে” লেখা, সেগুলো এড়িয়ে চলুন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

মালয়েশিয়া কলিং ভিসা কি এখন চালু?
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী ধাপে ধাপে নিয়োগ শুরুর প্রক্রিয়া চলছে। তবে সবার জন্য একসঙ্গে পুরোপুরি চালু হয়েছে, এমন নিশ্চিত খবর আমি পাইনি। সরকারি বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

নিজে কি কলিং ভিসার আবেদন করা যাবে?
না। মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তা ও অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমেই এই প্রক্রিয়া হয়।

বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মীর সুযোগ কীভাবে পাব?
এই দলটি বোয়েসেলের মাধ্যমে যাবে। বাছাইয়ের নিয়ম ও আবেদনের পদ্ধতি সরকার জানালে সেটাই অনুসরণ করুন।

এখনই মেডিকেল করিয়ে রাখলে লাভ হবে?
না। সরকার বলেছে নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত মেডিকেল করানো যাবে না। আগে করালে টাকা নষ্ট হতে পারে।

কোন এজেন্সি পাঠাতে পারবে?
মালয়েশিয়ার সরাসরি বাছাই করা ২৫টি এজেন্সি, তাদের সহযোগী ৩১২টি এজেন্সি এবং বোয়েসেল।

কতজন কর্মী যাবেন?
ছয় মাসে প্রায় দুই লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য আছে, যার মধ্যে ১০ হাজার বিনা খরচে।

সংক্ষেপে উত্তর

মালয়েশিয়া সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে ধাপে ধাপে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া শুরু করবে, আর ছয় মাসে প্রায় দুই লাখ কর্মী পাঠানোর কথা। তবে আমি লেখাটি তৈরির সময় প্রথম দলটি আসলে মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছে, এমন কোনো নিশ্চিত খবর পাইনি। অর্থাৎ সরকারি ঘোষণা আছে, লক্ষ্য ঠিক করা আছে, কিন্তু সাধারণ কর্মীর জন্য পূর্ণাঙ্গ নিয়মকানুন ও আবেদনের সরকারি বিজ্ঞপ্তি এখনো আপনাকে নিজে যাচাই করে নিতে হবে।

শেষ কথা

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলছে, এটা এখন আর শুধু গুজব নয়। দুই দেশের সরকার স্তরে সম্মতি হয়েছে, এজেন্সি ঠিক হয়েছে, লক্ষ্যমাত্রাও ঘোষণা হয়েছে। তবে আপনার ব্যক্তিগত আবেদন কবে, কীভাবে এবং কত খরচে হবে, সেটা সরকারি বিজ্ঞপ্তি ছাড়া কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। তাই ধৈর্য ধরুন, কাগজপত্র তৈরি রাখুন, আর কাউকে টাকা দেওয়ার আগে সরকারি সূত্রে যাচাই করুন। নতুন কোনো আপডেট এলে Visaedify.com-এ জানিয়ে দেওয়া হবে।

Leave a Comment